মাটির গন্ধে গড়া এক জীবন
![]() |
— জেমস আব্দুর রহিম রানার আত্মকথা
রাত যত গভীর হয়, চারপাশ তত নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে।
এই নীরবতা শূন্য নয়—এ যেন এক অদৃশ্য আয়না, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। সেখানে ফিরে আসে না বলা কথা, জমে থাকা কষ্ট, হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর সময়ের ভেতর হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি।
আমি সেই নীরবতার মধ্যেই নিজের জীবনকে দেখি।
এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, নয় সাজানো কোনো গল্প—এটি আমার জীবনের সত্য, এক সংগ্রামের ইতিহাস।
আমি জেমস আব্দুর রহিম রানা—অনেকেই আমাকে রহিম রানা নামেই চেনে।
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের খাকুন্দি গ্রামের মাটিতেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আমি তৃতীয়।
আমার শৈশব ছিল না স্বাচ্ছন্দ্যের ছায়ায় ঢাকা। বরং অভাব, অনিশ্চয়তা আর নীরব সহ্যশক্তির ভিতর দিয়েই শুরু হয়েছিল আমার জীবনযাত্রা।
আমার বাবা, দাউদ আলী বিশ্বাস—একজন সাধারণ মানুষ, কিন্তু তাঁর জীবন ছিল অসাধারণ সততা আর আত্মমর্যাদার প্রতীক। কখনো দিনমজুর, কখনো ছোটখাটো ব্যবসা—যেভাবেই হোক তিনি আমাদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।
১৯৯০ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান।
সেদিন শুধু একজন বাবাকে হারাইনি—হারিয়েছিলাম আমাদের আশ্রয়, আমাদের নিরাপত্তা। মনে হয়েছিল, মাথার ওপরের আকাশটাই যেন ভেঙে পড়েছে।
সেই সময়েই বুঝে গিয়েছিলাম—জীবন কাউকে সময় নিয়ে বড় করে না, কখনো কখনো হঠাৎ করেই বড় করে দেয়।
বাবার মৃত্যুর আগেই আমাদের পরিবার ভাঙনের পথে ছিল। বড় বোন বাধ্য হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। ছোট ভাই তখন একেবারে শিশু, আর মা—সময়ের ভারে ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন।
শৈশব বলতে যা বোঝায়, তা আমার খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে যায়।
তারপর শুরু হয় দায়িত্বের জীবন—যেখানে স্বপ্ন দেখার চেয়ে বেঁচে থাকাটাই বড় লড়াই।
বাবার মৃত্যুর পর আমরা শুধু দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়িনি, লড়েছি অবিচার আর অপমানের সঙ্গেও। এমন সময়ও এসেছে, যখন আমরা বাবার কবর পর্যন্ত রক্ষা করতে পারিনি।
আজ সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে খাকুন্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—উন্নয়নের প্রতীক হয়ে।
কিন্তু সেই মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে আমাদের এক টুকরো ইতিহাস, এক অদৃশ্য কষ্টের গল্প।
পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগেও ছিল বঞ্চনার ছাপ। কয়েক একর জমির মধ্যে বাবার অংশে আসে মাত্র ৬ শতাংশ। সেই সামান্য জমিই আজ আমাদের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।
আমাদের পরিবার এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে—কেউ দেশের বাইরে, কেউ জীবনযুদ্ধের ভেতর হারিয়ে গেছে।
তবুও সেই ভাঙা সম্পর্কের মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা।
খুব ছোট বয়সেই বুঝে গিয়েছিলাম—জীবন সহজ নয়।
তাই থেমে না থেকে পড়াশোনা চালিয়ে গেছি, নিজের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি খুঁজেছি।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যুক্ত হই লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে।
মানুষের গল্প বলতে বলতে একসময় বুঝেছি—কলম শুধু শব্দ নয়, এটি দায়িত্ব, এটি সত্য প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম।
আমার মা—আজও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সময় তাঁর শরীরকে দুর্বল করেছে, কিন্তু মনকে নয়।
তবে জীবনের সবচেয়ে নীরব কষ্ট এসেছে কাছের মানুষদের কাছ থেকেই।
যে ভাইকে নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে বড় করেছি, আজ তার সঙ্গেই তৈরি হয়েছে দূরত্ব।
জীবনে অনেক মানুষ এসেছে—কেউ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কেউ স্বপ্ন দেখিয়েছে, আবার সময়ের স্রোতে হারিয়েও গেছে।
এক দীর্ঘ সম্পর্কের ভাঙন আমাকে শিখিয়েছে—সব ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না।
তবুও আমি থামিনি।
কারণ থেমে থাকার সুযোগ আমার কখনো ছিল না।
আমি ধনী নই, বিলাসিতার জীবনও আমার নেই।
কিন্তু আমার আছে আত্মসম্মান—আর সেটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।
গভীর রাতে যখন নিজের দিকে তাকাই, মনে হয়—মানুষ নিজেই এক বিস্ময়।
এক বিন্দু থেকে সৃষ্টি হয়ে সে বয়ে বেড়ায় স্বপ্ন, বেদনা আর ভালোবাসার এক বিশাল পৃথিবী।
আজ আমি গর্ব করে বলি—
আমি কৃষকের সন্তান,
আমি দিনমজুরের সন্তান,
আমি এই মাটির মানুষ।
এই মাটির গন্ধই আমাকে শিখিয়েছে—
কীভাবে নিঃশব্দে লড়াই করতে হয়,
কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়।
